Uncategorized

সম্প্রতি সৌদি-মার্কিন দ্বন্দ্বের রহস্যঃ প্যাট্রিয়ট অপসারণ ও ইরান প্রসঙ্গে

…….লিটন মাহমুদ

আমেরিকার সমর্থন না থাকলে সৌদি রেজিম এক সপ্তাহও টিকবে না, মাঝে মাঝেই আমেরিকা সৌদি রেজিমকে সতর্ক করানোর জন্য যখন এই ধরনের পরোক্ষ হুমকি দেয় তখন‌ সৌদি রেজিমকে আমেরিকার প্রয়োজনীয়তা গুরুত্ব সহকারে জিকির করতে হয়। তাই সৌদ বংশের এই রাজতন্ত্র টিকিয়ে রাখার জন্য, যারপরনায় আমেরিকার হুকুমের দাস হতে হলেও, কুঁচপরোয়া নেই, অনুগত ভৃত্যের ন্যায় আমেরিকার প্রেসক্রিপশন অক্ষরে অক্ষরে রাষ্ট্রে, সমাজে, সংস্কৃতিতে, পররাষ্ট্রনীতিতে মানতে হয়, বাস্তবায়ন করতে হয়। নচেৎ গাদ্দাফির মতো আমেরিকার আদালতে আসামি হতে হবে, আমেরিকার নিকট থেকে চরম শিক্ষা নিতে হবে।

সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানকে আমেরিকা তাদের ইউনিভার্সিটিতে আমেরিকান শিক্ষা দিয়ে তাকে হুনেবালে সম্রাট (ভবিষ্যত রাজা) মর্যাদায় অভিষিক্ত করেছে। এবার মোহাম্মদ বিন সালমান আমেরিকান শিক্ষা নিয়ে জাজিরাতুল আরবকে আমেরিকা বানানোর প্রচেষ্টায় লিপ্ত হয়েছে। ২০৩০ ভিশন সেট করেছে, আমেরিকার প্রেসক্রিপশনে মধ্যপ্রাচ্যে তাদের পররাষ্ট্রনীতি কি হবে সেটাও আমেরিকা প্রেসক্রিপশন দিয়ে দিয়েছে। কিন্তু হঠাৎ কেন সৌদির উপর আমেরিকা ক্ষেপে গেল? শুধু ক্ষেপেই যায় নি, তাৎক্ষণিকভাবে সৌদি আরবকে শাস্তি দেওয়ার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়ার হুমকি দিয়েছে।

হুমকির প্রথম পদক্ষেপে, সৌদি থেকে সরিয়ে নিচ্ছে প্যাট্রিয়ট মিসাইল ডিফেন্স সিস্টেমের দুইটি ব্যাটারি, দুই স্কোয়াড্রন যুদ্ধ বিমান ও ৩০০ সেনা।এপি’র সংবাদ অনুযায়ী-“The U.S. is pulling two Patriot missile batteries and some fighter aircraft out of Saudi Arabia, an American official said Thursday, amid tensions between the kingdom and the Trump administration over oil production.-AP1 তাহলে বুঝা যাচ্ছে, ট্রাম্প প্রশাসন ও সৌদি কিংডমের মধ্যে কোনো একটা সমস্যা তৈরি হয়েছে, যার কারণে আমেরিকা সামরিক রসদ ও সৈন্য সরিয়ে নিচ্ছে। আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, সামরিক রসদ ও সৈন্য সরিয়ে নেওয়ার সময় ট্রাম্প প্রশাসন ঘোষণা দিয়েছে যে-“US officials said they believe that a January strike that killed Iranian commander General Qassem Soleimani, along with the ongoing coronavirus pandemic that has hobbled Iran, have reduced Tehran’s capabilities in the region. Pentagon planners are considering shifting the limited assets to deal with other priorities, including efforts to counter expanding Chinese military influence in Asia.2

ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি অনুযায়ী- কাসেম সুলাইমানিকে হত্যা ও করোনা প্যানডেমিক বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষিতে ইরান অনেকটাই খুড়িয়ে খুড়িয়ে চলছে। মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের শক্তি ও প্রভাব অনেক কমে গেছে, ইরান আর আরব দেশগুলোর জন্য বড়ো কোনো হুমকি নয়। তাই সামরিক শক্তির একটা অংশ চীনের প্রভাব ঠেকানোর জন্য এশিয়ার ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। যদিও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন মূল ঘটনা অনেকটাযই আড়াল করে বলেছেন- ইরানের আক্রমণ থেকে সৌদি তেল শিল্পকে রক্ষা করার জন্যই প্যাট্রিয়ট ডিফেন্স মিসাইল সিস্টেম ও সেনা মোতায়েন করা হয়েছিল। এখন মধ্যপ্রাচ্য থেকে এই সকল সামরিক সরঞ্জাম সরিয়ে চীনকে মোকাবেলা করার জন্য তিনি ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে মোতায়েন করা হবে। কারণ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র করোনা আক্রান্ত হয়ে বিপর্যস্ত হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে চীন প্রভাব বিস্তার করেছে বলে বলা হচ্ছে। এইছিল সৌদি থেকে সেনা ও সামরিক রসদ সরঞ্জাম সরিয়ে নেওয়ার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ন্যারেটিভস। কিন্তু আসলেই কি তাই?

ইরানি প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি

কোনো একটা কাজকে বৈধতা দেওয়ার জন্য আমেরিকার সামরিক কৌশলবিদ এ ধরনের ন্যারেটিভস দাঁড় করাতে খুব এক্সপার্ট। ২০০৩ সালে ইরাকে হামলা করার সময় আমেরিকার ন্যারেটিভস ছিল- ইরাকে গণবিধ্বংসী রাসায়নিক অস্ত্র আছে, কিন্তু পরে এই ন্যারেটিভস মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। এরকম অনেক ন্যারেটিভ দিয়ে আমেরিকা অনেক অবৈধ কাজের বৈধতা হাজির করে।

আসলে কেন আমেরিকা প্যাট্রিয়ট ডিফেন্স মিসাইল সিস্টেমের দুটি ব্যাটারি, দুই স্কোয়াড্রন যুদ্ধবিমান ও ৩০০ সেনা সৌদি থেকে সরিয়ে নিচ্ছে? এ লেখায় কারণগুলো উদ্ঘাটনের চেষ্টা করবো। সৌদি মার্কিন দ্বন্দ্বের নেপথ্যে কারণ-

১. তেলের দরপতন ও মার্কিন অর্থনৈতিক মন্দাঃ বর্তমান বিশ্বে করোনা সংক্রমণে, অর্থনৈতিক লক ডাউনে ব্যাপক মাত্রায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। বিশেষ করে গত এপ্রিলে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তেল খাতের ব্যাপক দরপতন ঘটে। সিএনএন এর প্রতিবেদন অনুযায়ী- “America’s oil industry is getting crushed by the historic collapse in oil prices orchestrated by Saudi Arabia and Russia…… To survive, the US oil industry is slashing spending, cutting dividends and preparing for layoffs. Countless workers, many of them in Republican-leaning states like Texas, could lose their jobs. Some shale oil drillers that took on too much debt won’t survive at all.

২. আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের সাপ্লাই বেশী কিন্তু ডিমান্ড কম। চাহিদা ও সাপ্লাই ম্যাকানিজম ঠিক রাখতে গিয়ে আমেরিকা সৌদিকে পরামর্শ দিয়েছিল তেলের উৎপাদন কমানোর জন্য। কিন্তু সৌদি তেলের উৎপাদন বাড়িয়ে বাজারে রাশিয়ার সঙ্গে তেলের মুল্য যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার কারণে মার্কিন তেল শিল্পে বিপর্যয় নেমে আসে, মার্কিন তেল কোম্পানিগুলোর তেলের ব্যাপক দরপতন ঘটে। এতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সৌদির উপর ক্ষেপে গিয়ে মোহাম্মদ বিন সালমানকে হুমকি দেন। আলজাজিরা ও রয়টার্সের খবর অনুযায়ী, টেলিফোনে সৌদির প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানকে তেলের উৎপাদন না কমালে সৌদি থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার করা হবে বলে হুমকি দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। পরে মোহাম্মদ বিন সালমান নিজের অফিস থেকে সমস্ত লোকদের বের করে দিয়ে একান্তে মার্কিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে এই নিয়ে আলোচনা করেন।

৩. তাদের মধ্যে দেন দরবারের সমাধান না হওয়ায়, মার্কিন প্রশাসনের কয়েকজন সিনেটর সৌদির আরবের সমালোচনায় মুখর হয়। এপির সংবাদ অনুযায়ী- Some Republican senators warned in late March that if Saudi Arabia did not change course, it risked losing American defense support and facing a range of potential “levers of statecraft” such as tariffs and other trade restrictions, investigations and sanctions. এখানে সৌদিকে হুমকি দেওয়া হয় যে, সৌদি যদি তার গতিপথ পরিবর্তন না করে, সৌদিকে দেওয়া আমেরিকান ডিফেন্স সাপোর্ট প্রত্যাহার করা হবে, অবরোধ আরোপ, বাণিজ্য প্রতিবন্ধতাসহ বিভিন্ন ঝুঁকির সম্মুখীন হতে হবে। মার্কিন সিনেটররা আরো অভিযোগ করেন যে, “When Saudi Arabia ramped up oil production and slashed prices this year, the kingdom of exacerbating instability in the oil market, which was already suffering because of the coronavirus pandemic.”. সৌদি আরবের উপর আমেরিকার নাখোশ হওয়ার কারণ মূলত এটাই। কারণ আমেরিকার অর্থনীতি বর্তমানে চরমভাবে বিপর্যস্ত। করোনার প্রকোপ বেড়ে যাওয়ার পর দেশটির বেকারত্বের হার বেড়েছে ১৪.৭ শতাংশ, চাকরি হারিয়েছে ২০.৫ মিলিয়ন মানুষ। যেটা ২০০৮ সালের মন্দায় ছিল ৮.৭ মিলিয়ন এবং ২৬.৪ মিলিয়ন জনগণ আমেরিকান সরকারের নিকট বেকার ভাতার জন্য আবেদন করেছে।

মার্কিনীদের অর্থনীতি অনেক আগে থেকেই ধুকছে, সাম্প্রতিক সময়ে করোনা আক্রমণ মার্কিন অর্থনীতি দারুণভাবে বিপর্যস্ত হয়েছে। বিনিয়োগ কমেছে, শেয়ার বাজারে পতন ঘটেছে, তেল কোম্পানিসহ বিভিন্ন কোম্পানি দেউলিয়াত্বের মুখে পড়েছে, কোটি কোটি জনগণ চাকরি হারানোর ফলে বেকারত্ব চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে-“The traditionally warm relationship between the US and Saudi Arabia has been strained in recent weeks, as the price of oil crashed because of a Saudi oil price war with Russia and cratering demand due to the coronavirus pandemic. Many US oil firms are facing bankruptcy,” এই কারণে অবশেষে দুই দেশের মধ্যে দূরত্ব বৃদ্ধি পেয়েছে, এই পর্যায়ে এসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সৌদি থেকে সেনা ও সামরিক সরঞ্জাম সরিয়ে নিচ্ছে। শুধু সৌদি থেকেই না, আফগানিস্তান থেকেও সেনা ও সামরিক সরঞ্জাম সরিয়ে নিয়ে আফগান-মার্কিন যুদ্ধের ইতি ঘটানোর জন্য তালেবান গোষ্ঠির সাথে সন্ধিচুক্তিতে পৌঁছেছে। ইরাক থেকে সীমিত পরিসরে ধীরে ধীরে সেনাবাহিনী সরিয়ে নিচ্ছে। এর কারণ, অর্থনৈতিক চরম মন্দার কারণে সারা বিশ্বের ৮০০ মার্কিন সেনা অবস্থানের ব্যয় বহন করা মার্কিন যুক্তরাট্রের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না।

মার্কিন অর্থনৈতিক মন্দার এই মুহূর্তে সৌদিকে যদি মার্কিনীদের কাছ থেকে নিজেদের নিরাপত্তা কিনতে হয়, তাহলে বিপুল পরিমাণের অর্থ দিয়ে মার্কিনীদের প্যাট্রিয়ট ডিফেন্স সিস্টেম মোতায়েন রাখতে হবে, কিন্তু দীর্ঘদিন থেকে সৌদির অর্থনৈতিক অবস্থাও চরম ভাবে বিপর্যস্ত হয়েছে পড়েছে।

আমেরিকার প্রত্যার্পণ থেকে অগ্রগমন স্ট্রাটেজিঃ বিশ্বের আঞ্চলিক পরস্পর বিরোধী দেশগুলোর অন্তরদ্বন্দ্ব বিবাদ জিইয়ে রেখে অস্ত্র বাণিজ্য সম্প্রসারণ করা যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম অস্ত্র বাণিজ্য কৌশল। যেমন- উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে দক্ষিণ কোরিয়া, চীনের সঙ্গে জাপান, তাইওয়ান, ভিয়েতনাম, লাওস ইত্যাদি দেশসমুহ, ইরানের সঙ্গে সৌদির রাজতান্ত্রিক ব্লক, পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের, ভারতের সঙ্গে চীনের ইত্যাদি। এই সকল দেশের পরস্পর বিরোধিতা মার্কিন মিলিটারি ইন্ডাস্ট্রিকে প্রফিটেবল প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করেছে। দেশগুলোর মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, বিরোধিতা জিইয়ে রেখে বন্ধু দেশগুলো থেকে মাঝে মাঝে নিজেকে পিছুটান দেয় এবং মিত্রদেশের কৌশলগত দুর্বলতাকে কাজে লাগায়। এরপর অস্ত্র বাণিজ্য ও মোটা অংকের অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার জন্য দেনদরবার চলে।

যেটা আমার দেখেছি, সিরিয়া ইস্যুতে সৌদির সঙ্গে, আইএস ইস্যুতে ইরাকের সঙ্গে, থাড ডিফেন্স সিস্টেম মোতায়েন ইস্যুতে দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে, তালেবানকে মোকাবেলার জন্য আফগান সরকারের সঙ্গে, এখন দেখছি তেল বাণিজ্য ইস্যুতে সৌদির সঙ্গে। সিরিয়ার বাসার সরকারকে উৎখাতের লড়াইয়ে আমেরিকা ছিল নেতৃত্বের ভুমিকায়, সেই সিরিয়াতেই যখন বাসার আল আসাদ সরকার টিকে গেলো, সিরিয়াতে ইরানের প্রভাব ঠেকানোর জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ঘোষণা দিল, তাদের সামরিক বাহিনী সিরিয়াতে আর রাখবে না। যদি রাখে, তাহলে এর ব্যয় সৌদিসহ আরব দেশগুলোকে বহন করতে হবে বলে, আরব রাজতান্ত্রিক দেশগুলোর সঙ্গে দেনদরবার শুরু করে দিল। ফলে সৌদি আরব ভীত হয়ে সিরিয়াতে মার্কিন বাহিনীর সমস্ত ব্যয় বহন করার জন্য রাজি হলো।

তারপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সিরিয়া থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করতে চেয়েও, সৌদির অর্থায়নে সিরিয়ার তেল প্রধান প্রদেশগুলোতে ঘাঁটি গেঁড়ে বসলো। সৌদির সঙ্গে মার্কিনীদের সামান্য মনোমালিন্য মানে হল, সৌদিকে তার রেজিম টিকিয়ে রাখার বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ থ্রেট দেওয়া। যাতে সৌদি সরকার মার্কিনীদের জন্য মোটা অঙ্কের উপঢৌকন নিয়ে হাজির হয়। এই উপঢৌকন মার্কিন অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার জন্য এখন অনেক বেশী প্রয়োজন। যে সকল বিশ্লেষক, সৌদি-মার্কিন এই সমস্যা নিয়ে দুই দেশের দূরত্ব বৃদ্ধি পাওয়ার কথা বলছেন! আসলে এর চেয়ে দূরত্ব বৃদ্ধি পাওয়ার আর কোন সম্ভাবনা নেই। কারণ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সৌদি রেজিমের দুর্বল দিক খুব ভালোভাবে জানে। আমেরিকাকে ছাড়া সৌদি আরব যে টিকবে না, সৌদি রেজিম তাও ভালো করে জানে।

সৌদি আরব এই দূরত্বটুকু উপঢৌকন দিয়ে মিনিমাইজ করে ফেলবে। এই রকম প্রচুর ঘটনা সৌদি মার্কিনীদের মধ্যে ঘটেছে। সব কথার এক কথা হলো, সৌদি মার্কিন দ্বন্দ্ব, আর্থিক লেনদেনের দ্বন্দ্ব। সৌদি আরব, যদি আমেরিকাকে এক নির্দিষ্ট অঙ্কের অর্থ উপঢৌকন স্বরূপ প্রদান করে, তাহলেই এই সমস্যা মিটে যাবে। ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের ভাষ্য অনুযায়ী, মধ্যেপ্রাচ্যে ইরান ও ইরানের প্রভাব কি দুর্বল হয়ে পড়েছে? সত্যি বলতে কি- ট্রাম্প প্রশাসনের এই ধরনের দাবীর কোনো সত্যতা নেই। জাস্ট কৌশলগত চাতুরতা থেকে পীঠ বাঁচানোর জন্য নির্জলা অসত্য বয়ান দেওয়া হয়েছে। কারণ-

১. কাসেম সুলাইমানির মৃত্যুর পর ইরান আগের চেয়ে আরো বেশী সুসংহত হয়েছে। কাসেম সুলাইমানি শাহাদতের পর সুলাইমানি, ইসলাম, ইরান, প্রতিরোধ আন্দোলন, মার্কিন, ইসরাইল, ফিলিস্তিন, সৌদি, ইরানি নেতৃত্বের প্রতি আস্থা ইত্যাদি সম্পর্কে ইরানি জনগণের মনোভাব ইরানের নেতৃত্ববৃন্দ গভীরভাবে উপলব্ধি করে সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য মধ্যপ্রাচ্য ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিষয়ে পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণ করে ফেলেছেন। সেই অনুযায়ী- ইরান আগের চেয়ে অনেক বেশী গুণে মধ্যপ্রাচ্যে শক্তি সামর্থ্য নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। মার্কিন সামরিক ঘাঁটি গুঁড়িয়ে দেওয়া দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আর কেউ পারে নি। ইরাকী পার্লামেন্টে মার্কিন সেনাদের বহিষ্কারের আইন পাস হয়েছে, ইরাকি ও ইরানি জনগণের মধ্যে বন্ধুত্বের সেত বন্ধ তৈরি হয়েছে, ঐক্য নির্মাণ হয়েছে এবং সম্পর্ক জোরদার হয়েছে। তাতে এই অঞ্চলের জনগণ একটা সম্মিলিত শক্তি হিসেবে হাজির হয়েছে।

২. কাসেম সুলাইমানিকে হত্যা মানে কোনো একটা সার্বভৌম দেশের উচ্চ পর্যায়ের রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধিকে হত্যা করা, যিনি রাষ্ট্রীয় কাজে ইরাক সফরে গিয়েছিলেন। অন্য একটি সার্বভৌম দেশে, তাকে হত্যা করা আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। যার ফলে বিশ্ব জনমত যেমন ইরানের পক্ষে গেছে, তেমনি তা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে গিয়েছে। তাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নৈতিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে বিশ্ব মানবতার সম্মুখে পরাজিত হয়েছে।

৩. কাসেম সুলাইমানির শাহাদাতের পর, ইরান প্রভাবিত দেশ ও প্রক্সি দলগুলো মার্কিন সৌদি ব্লকের বিরুদ্ধে আগের চেয়ে দুর্দান্ত প্রতাপে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। তাকে হত্যার আগে কাতিউশা ক্ষেপণাস্ত্র ও গ্রেনেডসমূহ মার্কিন দূতাবাস ও সেনাঘাঁটির আশেপাশে পড়তো, আর এখন ক্ষেপণাস্ত্র ও গ্রেনেডসমূহ দূতাবাস ও সেনাঘাঁটির অভ্যন্তরে আঘাত হানে। ইরাক ও সিরিয়ার জনগণ মার্কিন সৈন্যদের দিকে পাথর নিক্ষেপ, রোডমার্চ করে, রাস্তায় দাঁড়িয়ে অবরোধ ও ব্যারিকেড তৈরি করে, জনগণ মার্কিনিদের জোর করে বের করে দেওয়া হবে বলে হুমকি দেয়, ইয়েমেনের হুথি আন্দোলনকারীরা মার্কিন সৌদি ব্লকের হাদীপন্থী সেনাদের অবস্থানে হামলা করে ৮০ জন সেন্যকে হত্যা করে প্রায় ২০০ জন সৈন্যকে আহত করে।

8. আফগানিস্তানে মার্কিনীদের যুদ্ধবিমান গুলি করে ভুপাতিত করা হয়েছে, যে বিমানে কাসেম সুলাইমানিকে হত্যার পরিকল্পনাকারীসহ সিআইএর উচ্চ পদস্থ সামরিক কর্মকর্তা ও কিছু সংখ্যক সৈন্য নিহত হয়েছে বলে খবরে এসেছে। লেবাননের হিজবুল্লাহ, ফিলিস্তিনের হামাস ও ইসলামিক জিহাদ, ইরাকের হাশদ আল শাবি, সিরিয়ান আর্মিসহ প্রতিরোধ ফ্রন্টের সাধারণ জনগণ পর্যন্ত মার্কিন-ইজরাইলি-সৌদি জালেম, অত্যাচারী, সাম্রাজবাদী ব্লকের বিরুদ্ধে বহুগুণ শক্তি, সামর্থ্য ও মনোবল বাড়িয়ে লড়াই করে যাচ্ছে এবং লড়াই করে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। এতো কিছুর পরেও কি করে মার্কিন প্রশাসন দাবি করে যে, মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের প্রভাব দুর্বল হয়েছে?

কাসেম সুলাইমানি শুধুমাত্র কোনো ব্যক্তি নয়, কাসেম সুলাইমানি এখন একটি আদর্শ। সুলাইমানি এখন একটা জাতি, একটা সমাজ, একটা রাষ্ট্র, একটা সংস্কৃতি, একটা দর্শন ও একটা ইতিহাস। সেখানে প্রতিটি পাতায় পাতায় জিন্দা শহীদকে জিন্দা শহীদ হিসেবেই পাওয়া যাবে। সুলাইমানি বিশ্ব সাম্রাজ্যবাদী অত্যাচারীদের সকল যুগেই, সকল স্থানেই তাড়িয়ে বেড়াবে। মুক্তিকামীদের অনুসরণীয় আদর্শ হিসেবেই জীবিত থাকবে। জালেম, অত্যাচারী বস্তুবাদীরা আসলে শাহাদাতের অর্থ বুঝতে অক্ষম।

সুলাইমানি শাহাদাতের পর ইরানের কমিটমেন্ট, সততা, সভ্যতা, ইতিহাস-ঐতিহ্য, জ্ঞান বিজ্ঞানের ভূয়সী প্রশংসা করে বক্তব্য দিয়েছেন, ইংল্যান্ডের বর্তমান রাজা। একই সাথে ইরান সফরের জন্য আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। আবারো বলি, এতো কিছুর পরেও কি মার্কিন প্রশাসন দাবি করতে পারে যে, মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের প্রভাব দুর্বল হয়েছে? ডোনাল্ড ট্রাম্প যিনি আন্তর্জাতিক মাস্তান হিসেবে পরিচিত, সুলাইমানির সাহাদাতের আগে ইরানকে হুমকি দিয়ে বলেছিলেন- ইরান যদি যুক্তরাষ্ট্রকে হুমকি দেয় তবে ইরানকে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হবে। প্রতি উত্তরে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাওয়াদ জারিফ বলেছিলেন- ইতিহাসে বর্বররা সবসময় আমাদের শহর, বন্দর সভ্যতাকে ধ্বংস করতে এসেছে, ধ্বংস করেছে, তবুও আমরা এখনো টিকে আছি, কিন্তু বর্বররা আজ কোথায়? বিশ্বের ইতিহাসে সবসময় বর্বরদের স্থান হয়েছে অতল গহ্বরে, পশ্চিমা বর্বর জালেম শাসকদের স্থান একদিন চিরাচরিত অতল গহ্বরেই হবে নিশ্চিত।

(লেখক- প্রভাষক, উত্তরা রেসিডেনসিয়াল কলেজ, ঢাকা)



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Articles

Back to top button
Close
%d bloggers like this: