Uncategorized

যে পরিমান সম্পদ থাকলে জাকাত দিতে হবে

যাকাত দিলে সম্পদ পবিত্রতা ও সম্পদ বাড়ে। যাকাত হল গরিবের হক। যাকাত দেয়া প্রত্যেক মুমিন মুসলিমদের কর্তব্য। জাকাত শব্দের অর্থ হচ্ছে বৃ’দ্ধি পাওয়া, বেশি হওয়া। ইহা হচ্ছে বিশেষ সম্পদে নির্ধারিত ব্য’ক্তিদের জন্য নির্দিষ্ট সময়ে আদায় করা ফরজ। জাকাত আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের পক্ষ থেকে নিসাব পরিমান সম্পদের মালিক বান্দার উপর ফরজ করা হয়েছে।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন, “তাদের মালামাল থেকে জাকাত গ্রহণ করুন যাতে তার মাধ্যমে তাদেরকে পবিত্র ও পরিচ্ছন্ন ক’রতে পারেন। আর তাদের জন্য দোয়া করুন; নি:সন্দে’হে আপনার দোয়া তাদের জন্য স্বান্ত্বনাস্বরূপ। বস্তুত : আল্লাহ সবকিছু শোনেন, জা’নেন। (সূরা তাওবাহ : আয়াত ১০৩); তাহলে কোন কোন জিনিসের জাকাত দিতে হয় এবং কি পরিমাণ সম্পদ হলে জাকাত দিতে হয়; তা জা’না মুসলমান মাত্রই অত্যন্ত আবশ্যক।

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন যে জাকাত বিধিবিধান ক’রেছেন তা তিন ধ’রণের-

প্রথম- সম্পদের জাকাত:

১. স্বর্ণ ও রূপা এবং সকল মুদ্রা;

২. ‘বাহিমাতুল আনআ’ম তথা উট, গরু, দুম্বা-ভেড়া ও ছাগল; যেগুলো মু’ক্তভাবে বিচরণকারী।

৩. জমিন থেকে যা বের হয়; যেমন- শস্যদানা, ফল-ফলাদি ও খনিজপদার্থ।

৪. ব্যবসা সামগ্রী;

দ্বিতীয়- ব্য’ক্তি দায়িত্বের ফরজ জাকাত। যা প্রতিটি মুসলিমের প্রতি রমজান মাসের শেষে ঈদের নামাজে’র পূর্বে আদায় করা ফরজ হয়। অর্থাৎ সাদাকাতুল ফিতর।
তৃতীয়- উত্তম দান খয়রাত। যা মুসলিম ব্য’ক্তি আল্লাহর নিকট বেশি ছাওয়াবের আশায় অন্যের প্রতি ইহসান করে থাকে।

১. স্বর্ণ ও রূপার জাকাত হচ্ছে আড়াই ভাগ (২.৫০%)

স্বর্ণের পরিমাণ : স্বর্ণ বিশ দিনার* ও এর অতিরি’ক্ত হলে শতকরা আড়াই ভাগ (২.৫০%) জাকাত ফরজ হবে। ২০ দিনার সমান হবে ৮৫ গ্রাম স্বর্ণ। যা ভরির হিসাবে সাড়ে সাত তোলা বা ভরি।

রূপার পরিমাণ :

রূপা দুই শত ও এর অধিক সংখ্যা দিরহাম হলে বা ওজনে পাঁচ আওয়াক ও এর বেশি হলে শতকরা আড়াই ভাগ (২.৫০) জাকাত ফরজ হয়। এই হিসাবে দুই শত দিরহাম সমান ৫৯৫ গ্রাম হয়। যা ভরি/তোলার হিসাবে সাড়ে ৫২ তোলা রূপা হয়।

মনে রাখতে হবে- জাকাতে দেয়ার নিসাব বা পরিমাণ মিলানোর জন্য স্বর্ণ ও রূপা এক সাথে মিলানো যাবে না। আ’লাদা আ’লাদা হিসাবে হতে হবে।
*দিনার : এক দিনার (স্বর্ণমদ্রা) সমান হচ্ছে এক মিছকাল। আর এক মিছকাল বর্তমান যুগের হিসাবে

৪.২৫ গ্রাম।

মুদ্রাসমূহের জাকাত-

বর্তমান যুগের মুদ্রাসমূহ যেমন- রিয়াল, ডলার, টাকা ইত্যাদির বিধান স্বর্ণ-রূপার বিধানের মতোই। কিমাত তথা বর্তমান মূল্যের ভিত্তিতে নির্ধারণ ক’রতে হবে।মুদ্রা পরিমাণ যখন স্বর্ণের বা রূপার মূল্যের সম পরিমান নেসাবে পৌঁছবে তখন তাতে জাকাত ফরজ হবে। আর জাকাত আদা’য়ের পরিমাণ হচ্ছে ২.৫০% ভাগ যখন পূর্ণ এক বছর অতিবাহিত হবে।

মুদ্রার জাকাত বের করার পদ্ধতি :

যেমন ধ’রা যাক- বর্তমান বাজারে এক ভরি স্বর্ণের দাম ৫০,০০০/- পঞ্চাশ হাজার টাকা তাহলে সাড়ে সাত ভরি স্বর্ণের দাম হবে ৩,৭৫,০০০/- তিন লাখ পঁচাত্তর হাজার টাকা। যার নিকট সর্ব নিম্ন এই টাকা থাকবে, তাকে ২.৫০% আড়াই ভাগ জাকাত আদায় ক’রতে হবে। অর্থাৎ তাকে ৯,৩৭৫/- নয় হাজার তিন শত পঁচাত্তর টাকা জাকাত দিতে হবে।
অথবা

সমস্ত সম্পদকে ৪০ দ্বারা ভাগ করলে দশ ভাগের এক চতুর্থাংশ দাঁড়াবে। আর ইহাই স্বর্ণ-রূপার ও এর হুকুমে যা আসে তার জাকাত। মনে করুন এক জনের নিকট টাকা আছে ৩,৭৫,০০০/- তিন লাখ পঁচাত্তর হাজার টাকা (৩,৭৫,০০০/৪০=৯৩৭৫/-) ইহা হচ্ছে তার ঐ তিন লাখ পঁচাত্তর হাজার টাকার জাকাত। আর ইহা দশ ভাগের এক চতুর্থাংশ।

২. ‘বাহিমাতুল আনআ’ম তথা উট, গরু, দুম্বা-ভেড়া ও ছাগল-এর জাতাতের দু’টি অবস্থা :

ক. যখন এ পশুগুলো একটি পূর্ণ বছর বা অধিকাংশ সময় বৈ’ধ মরুভূমি বা খোলা মাঠে কিংবা চারণভূমিতে মু’ক্তভাবে বিচরণ করবে। বছর পূর্ণ হওয়ার পাশাপাশি নির্ধারিত নিসাবে বা পরিমাণে পৌঁছবে তখন তাতে জাকাত ফরজ হবে। চাই তা দুধের জন্য বা বাচ্চা নেয়ার জন্য বা মোটা-তাজা করার জন্য হোক। প্রতিটি পশুর যে জাতি রয়েছে জাকাত তার জাতি দ্বারাই আদায় ক’রতে হবে। জাকাত দেয়ার সময় সর্বোত্তম বা সর্বনিম্ন মানের পশুটি নেয়া যাবে না। বরং মধ্যমটি গ্রহণ ক’রতে হবে।

খ. যখন এ পশুগুলোর খাদ্য নিজে’র বাগান থেকে বা ক্রয় করে ব্যব’স্থা করা হবে। যদি এগুলো ব্যবসার নিয়্যতে ক্রয় করে আর তার উপর এক বছর অতিবাহিত হয় তবে বিক্রয় মূল্য নির্ধারণ করে ২.৫০% (আড়াই ভাগ) জাকাত দিতে হবে।

আর যদি ব্যবসার জন্য না হয়; বরং দুধ বা বাচ্চা দেয়ার জন্য হয় এবং পশু খাদ্যের ব্যব’স্থা মালিককে ক’রতে হয় তবে এতে কোনো জাকাত নেই।

পশুরু নিসাব

১. মেষ (দুম্বা-ভেড়া) ও ছাগলের সর্বনিম্ন নিসাব হচ্ছে ৪০ টি (চল্লিশটি); এ পশুগুলো ৪০ থেকে ১২০ পর্যন্ত জাকাতের পরমাণ একটি মেষ বা ছাগল; ১২১ থেকে ২০০টির জন্য দু’টি মেষ বা ছাগল; ২০১ থেকে ৩৯৯ পর্যন্ত তিনটি মেষ বা ছাগল। এরপর প্রতি শ’তে একটি করে চলতে থাকবে।

২. গরুর সর্বনিম্ন নিসাব হচ্ছে ৩০ টি (ত্রিশটি); গরু ৩০-৩৯ হলে এক বছরের একটি বেটা বা বেটি বাছুর; ৪০-৫৯ হলে দু’বছরের একটি বেটি বাছুর; ৬০-৬৯ হলে দু’টি এক বছরের বেটা বা বেটি বাছুর; ৭০-৭৯ হলে দু’বছরের একটি বেটি বাছুর ও এক বছরের একটি বেটা বাছুর জাকাত দিতে হবে।

এরপর প্রতি ৩০টিতে একটি বেটা বা বেটি বাছুর; এবং প্রতি ৪০টিতে দু’বছরের একটি বেটি বাছুর। ৫০টি গরুতে দু’বছরের একটি বেটি বাছুর; ৭০ গরুতে একটি এক বছরের বেটা বা বেটি বাছুর ও দুই বছরের একটি বেটি বাছুর এবং ১০০ টি গরুতে দুইটি এক বছরের বেটা বা বেটি বাছুর ও একটি দু’বছরের বেটি বাছুর। আর ১২০টি গরুতে চারটি এক বছরের বেটি বাছুর অথবা তিনটি দু’বছরের বেটি বাছুর। গরুর জাকাতের হিসাব এভাবেই চলতে থাকবে।

৩. উটের সর্বনিম্ন নিসাহ হচ্ছে সর্বনিম্ন ৫টি-

৫টা থেকে ৯টা পর্যন্ত ১টি ছাগল

১০টা থেকে ১৪ পর্যন্ত ২টি ছাগল

১৫ থেকে ১৯ পর্যন্ত ৩টি ছাগল

২০ থেকে ২৪ পর্যন্ত ৪টি ছাগল

২৫ থেকে ৩৫ পর্যন্ত এক বছরের (বিনতে মাখাজ) একটি উষ্ট্রী

৩৬ থেকে ৪৫ পর্যন্ত দু’বছরের একটি উষ্ট্রী (বিনতে লাবূন)

৪৬ থেকে ৬০ পর্যন্ত (হিক্কাহ) তিন বছরের একটি উষ্ট্রী

৬১ থেকে ৭৫ পর্যন্ত (জিয্আ) চার বছরের উষ্ট্রী

৭৬ থেকে ৯০ পর্যন্ত ২টি বিনতে লাবূন (দু’বছরের দু’টি উষ্ট্রী)

৯১ থেকে ১২০ পর্যন্ত ২টি হিক্কাহ (তিন বছরের ২টি উষ্ট্রী)

(যেহেতু আমাদের দেশে এত সংখ্যক উট হয় না বিধায় উটের জাকাত নিসাব এটুকুই রাখছি)

৩. জমিন থেকে যা বের হয়; যেমন- শস্যদানা, ফল-ফলাদি ও খনিজপদার্থ।

শস্যদানা ও ফলাদির জাকাত ফরজে’র শর্তসমূহ-

জাকাত ফরজ হওয়ার সময় মালিকানাভুক্ত হতে হবে। অনুরুপ নিসাব পরিমাণ হতে হবে।
নিসাব হচ্ছে ৫ ‘ওয়াসাক’ এক ওয়াসাক সমান ৬০ সা’আ। তাহলে ৫ * ৬০= ৩০০ সা’আ।
এক সা’আ উত্তম গমের মাপ হয় প্রায় ২.৪০ কেজি। তাহলে ৩০০ * ২.৪০=৬১২ কেজি নিসাব।

একই প্রকারে ফল-ফলাদি হলে যেমন খেজুর এক বছরের সমস্ত ফল নিসাব পূরণের জন্য একত্র ক’রতে হবে।

হাদিসে এসেছে-

রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘পাঁচ আওয়াকের কমে জাকাত নেই। পাঁচটি উটের কমে জাকাত নেই। পাঁচ ওয়াসাকের কমে জাকাত ফরজ নেই।’ (বুখারি ও মুসলিম)।

১. উশর একদশমাংশ (১০% ) : ইহা বিনা খরচে উৎাদিত হলে যেমন : বৃষ্টির পানি বা ঝর্ণার পানি দ্বারা।

২. অর্ধেক উশর একবিশমাংশ (৫%) : ইহা সেচ দ্বারা উৎপাদিত হলে। যেমন- কুপের বা গ’ভীর নলকূপ কিংবা পুকুর বা নদীর পানি মেশিন ইত্যাদি দ্বারা সেচ দিয়ে উৎপাদিত ফসল বা ফল।

হাদিসে এসেছে-

রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘যা বৃষ্টি ও ঝর্ণার পানি দ্বারা সেচ হয় বা বৃষ্টির পানিতে সিক্ত শষ্যক্ষেত্র তার জাকাত একদশমাংশ (১০%) ; আর যা সেচ দ্বারা পানি দেয়া হয় তার জাকাত একবিশমাংশ (৫%)। (বুখারি)

৩. তিনদশমাংশ (৭.৫০%) : ইহা সেচ ও বৃষ্টি উভ’য় পানি দ্বারা হলে। অর্থাৎ একবার সেচেরে পানি দ্বারা আর একবার বৃষ্টির পানি দ্বারা হলে তিনদশমাংশ হারে জাকাত দিতে হবে।

জাকাত ফরজে’র সময় :

— শস্যদানা ও ফল-ফলাদির দানা যখন শক্ত হবে ও ফল পেকে যাবে তখন জাকাত ফরজ হবে। ফল পাকা মানে হলো- যখন লাল বা হলুদ হয় যায়। সুতরাং বিক্রেতা যদি এর পরে বিক্রি করে তাহলে জাকাত বিক্রেতার উপর ফরজ; ক্রেতার উপর নয়।

— যদি মালিকের অবহেলা ও ত্রুটি ছাড়াই ফসল ন’ষ্ট হয়ে যায় তবে তার ফরজ জাকাত বাদ হয়ে যাবে।

— সকল প্রকার সবজি অর্থাৎ যে সকল সবজি ফল-ফলাদি গুদামজাত করা যায় না তার উপর কোনো জাকাত নাই। কিন্তু যদি উহা ব্যবসা সামগ্রী হয়ি এবং তার বিক্রি মূল্যে বছর অতিক্রম ও নিসবা পরিমাণ হয় তবে (২.৫০%) শতকরা আড়াই ভাগ ফরজ জাকাত আদয় ক’রতে হবে।

৪. ব্যবসা সামগ্রী :

কেনা-বেচার জন্য প্র’স্তুতকৃত সামগ্রীকে “উরুযুত্তিজারা” বলা হয়। যেমন- স্থাবর সম্পত্তি, পশু, খাদ্য, পানীয় ও মেশিনপত্র ইত্যাদি।

ব্যবসা সামগ্রীর জাকাতের বিধান-

ব্যবসা সামগ্রী যখন নিসাবে পৌঁছবে ও তার প্রতি এক বছর অতিক্রম হবে তখন তার উপর জাকাত ফরজ হবে। বছর পূর্ণ হলে স্বর্ণের বা রূপার যে নিসাব জাকাতের হকদারদের জন্য বেশি উপকারী সে হিসাবে সমস্ত বিক্রয় মূল্য অথবা ব্যবসা সামগ্রী থেকে ২.৫০% আড়াই ভাগ জাকাত নির্ধারণ ক’রতে হবে।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমাদেরকে উপরোক্ত নিয়মে জাকাত দেয়ার তাওফিক দান করুন। আমীন।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Articles

Back to top button
Close
%d bloggers like this: