Uncategorized

কেমন হতে পারে করোনা পরবর্তী দুনিয়া

……..সাইফুল খান

তুরস্ক সম্পর্কে আমার একটা প্রেডিকশন হচ্ছে শুধুমাত্র হাফতার বাহিনীর বিপক্ষে জাতিসংঘের পক্ষ নিয়ে লিবিয়ায় যুদ্ধ করতে যায় নি তারা। তাদের নিজস্ব একটা উচ্চাভিলাষী পজিশন আছে। এরদোগান আর যাহোক নিজেকে উসমানীদের উত্তর প্রজন্ম মনে করে এবং সেই আভিজাত্য আর প্রভাব ফিরে পাওয়ার বাসনাও করে। এই ফিরে পাওয়ার বাসনাকে মত, ধর্মীয় মতবাদ বা ক্রিটিক করে ডিফাইন বা এনালাইসিস করার চেষ্টা হবে পক্ষপাতমূলক। তুরস্কের যেকোন মতের নেতাই তার সোনালী অতীত নিয়ে গর্ব করতে পারেন এবং ফিরে যেতে চাইতেই পারেন। 

আগের কথায় ফিরে যাই। তুরস্ক লিবিয়া নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে ভূমধ্যসাগরের দিকে নজর দেবে। ভূমধ্যসাগরের দুই পাশে (আফ্রিকা-ইউরোপ) তুরস্কের প্রভাব থাকা মানে মিশর থেকে মরক্কো এবং গ্রিস থেকে স্পেন পর্যন্ত নজর দেয়ার সুযোগ তৈরি হওয়া। সেই উচ্চাভিলাস উত্তর আটলান্টিক পর্যন্তও পৌঁছাতে পারে।

অন্যদিকে জানা গেছে, সৌদিজোটের বিরুদ্ধে তুরস্ক ইয়েমেনে সেনা পাঠাতে যাচ্ছে। ইয়েমেনে তুর্কি সেনার উপস্থিতি সৌদিকে দুইভাবে বেকায়দায় ফেলবে।

১. যুদ্ধটা তখন দুই মডার্ন টেকনোলজি দিয়ে হবে যেখানে ইয়েমনিদের সাথে সৌদি জোট এমনিতেই পেরে উঠছে না। ফলে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত বা সৌদির পরাজয় তাদের রাজতন্ত্রকে হুমকির মুখে ফেলবে।

২. লোহিত সাগর সংযুক্ত হয়েছে গাল্ফ অব এডেনে এবং সেটা পড়েছে গিয়ে আরব সাগরে। এখানেও তুরস্ক কৌশলগত পজিশন নিতে পারে। আন্তর্জাতিক তেল বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণের রুটগুলো এদিক দিয়েই।

এখন একটা বিষয় অন্তত পরিষ্কার হবে যে, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে তুরস্ক কোন পজিশনে থাকতে চায়। লিবিয়া, ইয়েমেন (এখনো যায় নি তারা) থেকে যদি অপারেশন শেষ করে ফিরে আসে তাহলে বুঝতে হবে এই তুরস্ক উসমানীদের ইতিহাস তুলে আনে মূলত অভ্যন্তরীণ রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে এবং রাজনীতির বাগাড়াম্বারপূর্ণ কথার কথা’র অংশ হিসেবে।

আন্তর্জাতিক বাণিজ্য রুটগুলো নিয়ন্ত্রণে রেখেই দুনিয়াকে শাসন করার নীতি নিয়েছে চীন। এটাই এখন বৈশ্বিক কৌশল তাই তুরস্ক যদি সেই স্বপ্ন দেখে তবে কৌশল অবলম্বন করবে এটাই স্বাভাবিক। 

করোনা উত্তর বিশ্ব অর্থনীতি বিশাল একটা ধাক্কা খাবে এতে সন্দেহ নেই। সবচেয়ে বড় ধাক্কা খাবে যুক্তরাষ্ট্র। দুনিয়াব্যাপী তাদের সামরিক উপস্থিতি, প্রক্সি মিলিট্যান্ট, এনজিও, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, মিত্রদের নিরাপত্তা, মহাকাশ গবেষণা, যুদ্ধ শিল্পকে চালিয়ে নিতে যে পরিমাণ অর্থ প্রয়োজন সেটা ঠিক রেখে আমেরিকার নাগরিকদের চলমান নাগরিক সুবিধাবাদী দিয়ে টিকে থাকা খুব সহজ ব্যাপার না বরং অসম্ভবই।

এটা আমেরিকার জন্য খুব বেশি সমস্যা হতো না যদি বিশ্ব অর্থনীতিতে চীনের বিশাল পুঁজি না থাকতো। অর্থনীতিতে চীন এক দানবের ভূমিকায় আছে। সামরিক ও গবেষণায় ইরান, রাশিয়া, তুরস্কের প্রভাব বাড়ছে। যারা আঞ্চলিকভাবে  আমেরিকার প্রভাবের বিকল্প হিসেবে দাঁড়াবে। ইতোমধ্যে কিছু কিছু ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়েও দিয়েছে।

তবে মার্কিন সাম্রাজ্যের পতন এখনই হচ্ছে না। পতনের সূচনা হলেও এক দশক পেরিয়ে যাবে অনায়াসেই। পতনের সূত্রপাত বাংলাদেশ থেকেও বোঝা যাবে। বাংলাদেশে পশ্চিমা অনুদানে চলা এনজিও সমূহ যারা নিজেদের বিকল্প সরকার মনে করে সরকারের উপর প্রভাব খাটায় এগুলো বন্ধ হবে, পশ্চিমা দান খেয়ে বাঁচা বুদ্ধিজীবীদের ‘কচকচানি’ শোনা যাবে।

ভূঁই ফোড় গবেষণা প্রতিষ্ঠান, ফাউন্ডেশন, মিডিয়াও বন্ধ হবে। এইসব সিম্পটম্পই বলে দেবে মার্কিন সাম্রাজ্য কোনদিকে রওনা করছে। এগুলো যত দেরিতে প্রকাশ পাবে পতনের দিকেও তত দেরিতে ধাবিত হবে। 

আমেরিকাও বসে নেই। তাদের গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো বিশেষকরে NIC Global Trends 2025,  NIC Global Trends 2030, NIC Global Trends 2035. যেগুলো পর্যায়ক্রমে ২০০৮, ২০১২ এবং ২০১৭ সালে তাদের ভিন্ন ভিন্ন রিপোর্ট পেশ করেছে। সে সময় করোনা মহামারীকে মাথায় রাখা হয় নি। তারপরও সেখানে বলা হচ্ছে- চীন গ্লোবালী অর্থনীতিতে ১ নম্বর পজিশনে। পশ্চিমা সম্পদ জমা হবে পূর্বের দেশগুলোতে। আইএমএফ,বিশ্বব্যাংকের বিকল্প প্রতিষ্ঠান সৃষ্টি হবে। খাবার পানি, জ্বালানী সংকটে পড়বে পশ্চিমা দুনিয়া। প্রয়োজন মেটাতে পূবের মুখাপেক্ষী হতে হবে। এর প্রধানতম কারণ সস্তা শ্রম। সস্তায় পণ্য দিতে চাইলে সস্তা মজুরীর শ্রমিক দরকার যেটা শুধুমাত্র এশিয়াতেই সম্ভব।

ইউরোপের ২৭ টি দেশ যাকে আমরা ইইউ বা ইউরোপীয় ইউনিয়ন নামে চিনি। সেই ইউনিয়নের জনসংখ্যা প্রায় ৪৭ কোটি। এই ৪৭ কোটির অঞ্চল করোনা পরিবর্তিত বিশ্বে একটা মহামন্দায় পড়তে যাচ্ছে। করোনায় বিধ্বস্ত অর্থনীতি হয়ত জার্মানি সহ কয়েকটি দেশ রিকভারি করার ক্ষমতা রাখে কিন্তু বাকিদের অবস্থা হবে শোচনীয় বিশেষ করে গ্রিস। অনেক ইন্ড্রাস্ট্রিজ হয়ত রি-ওপেন সম্ভব হবে না। বৈশ্বিক যুদ্ধ বিগ্রহ যেটাকে ইউরোপ আমেরিকা ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ” নামে একটা বৈধ বিশেষণ দিয়েছিলো সেটার কারণে যে বিশাল জনগোষ্ঠী রিফিউজি হয়েছে সেই রিফিউজিদের লালন পালন করা সম্ভব হবে না। তারমানে দুনিয়াজুড়ে ক্ষুধার্ত মানুষের হাহাকার আকাশ ভারী করে তুলবে।

ইইউ ভেঙে পড়ার গুঞ্জন হয়তো সত্যি হবে। এর প্রধানতম কারণ করোনাকালীন সম্পর্কের ফাটল, অবিশ্বাস, পরস্পরের প্রতি সাহায্য সহযোগিতার হাত না বাড়ানো। যা ইউনিয়ন সৃষ্টির উদ্দেশ্যকে নিশ্চিহ্ন করেছে বলা যায়। আপনি বাচলে বাপের নাম টাইপের অবস্থা তাদের মধ্যে। তাদের মধ্যে দীর্ঘদিনের অবিশ্বাস ও বিভাজন নিয়েও এতদিন টিকে ছিলো কিন্তু এখন হয়তো আর সম্ভব না। ইউরোপের ইন্ড্রাস্ট্রিগুলোকে টিকতে হলে কম খরচের শ্রম অঞ্চলে তাদের শিফট করতে হবে। ইউরোপীয় কোম্পানিতে প্রায় ৫০ লক্ষাধিক আমেরিকান কাজ করে। তাহলে তাদের কি হবে?  মোটা দাগের প্রশ্ন। তারা বেকার হবে। এত বড় সংখ্যক বেকারত্ব এবং অন্যান্য বেকারদের দুই দশকেও কাজ দেয়ার অবস্থা থাকবে না আমেরিকার। আমেরিকান অর্থনীতি সংকুচিত হবে, জনগণের ক্রয় ক্ষমতা কমবে। এর প্রভাব সারা দুনিয়ায় উপর পড়বে।

চীন বিশ্বের বেশিরভাগ কাচামালের উৎপাদনকারী দেশ এবং সস্তা পণ্য নির্মাণ ও বাজারজাতে প্রথম অবস্থানে আছে। কিন্তু বৈশ্বিকভাবে ইন্ড্রাস্ট্রি বন্ধ হলে, ক্রয় ক্ষমতা কমলে চীনের বাণিজ্যও হ্রাস পাবে। তাদের অর্থনীতিতেও ধ্বস নামবে। ধারনা করা হচ্ছে চীনে প্রায় ১০ কোটি মানুষ কর্মহীন হবে যাদের অনেকেই কোনদিনও আর আগের কর্মস্থলে ফিরতে পারবে না।

মধ্যপ্রাচ্যের শুধুমাত্র তেল নির্ভর দেশগুলো বিপাকে পড়বে। ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র সৌদি থেকে প্যাট্রিয়ট ব্যাটারি সরিয়ে নিচ্ছে। এর কারণ হিসেবে সৌদি -আমেরিকার তেল বাণিজ্য দ্বন্দ্বের কথা বলছেন বিশ্লেষকগণ। আমেরিকা পৃথিবীর প্রধান তেল পরিশোধনকারী দেশ। পরিশোধিত তেল বিক্রিতে আমেরিকা শীর্ষে। সাম্প্রতিক বিশ্বব্যাপী লকডাউনে তেলের চাহিদা কমে যায়। ফলে তেলের দরপতন ঘটে, এছাড়া আমেরিকায় এখন পরিশোধিত তেল রাখার যায়গা নেই। এত তেল সে রিজার্ভ করেছে। এমতাবস্থায় সৌদি তেল উত্তোলন না কমালে আমেরিকার তেল বাণি বিশাল ক্ষতির মুখে পড়বে। আমেরিকার অনুরোধ সত্ত্বেও সৌদি তেল উত্তোলন কমাচ্ছে না। ধারনা করা হচ্ছে এজন্যই সৌদির প্রতি নাখোশ হয়ে তাদের তেল ক্ষেত্রের নিরাপত্তায় রত দুটি মিসাইল ডিফেন্স ব্যবস্থা সরিয়ে নিচ্ছে। এছাড়া ইরাক,আফগানিস্তান থেকেও মার্কিন সৈন্য সরিয়ে নেওয়ার কাজ শুরু হওয়ায় এ অঞ্চলের মার্কিন মিত্ররা আতঙ্কিত হবে অপরদিকে ইরান সমর্থিত গ্রুপগুলো বিপুল উৎসাহ ও ক্ষমতা নিয়ে প্রভাব বিস্তার করবে।   

এছাড়া  মধ্যপ্রাচ্যের আরো দূর্বলতা হচ্ছে নিজেদের জন্য পণ্য উৎপাদন করে আভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটাতে না পারা, পরনির্ভরশীল স্বাস্থ্য ও খাদ্যের যোগান। এতে এই অঞ্চলের চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়ার সম্ভাবনা খুব বেশি। সাম্প্রতিককালে কাতারকে সৌদি ল্যান্ড লকড করে সেটা দেখিয়েছে। ইরান আর তুর্কি কাতারের পাশে না দাঁড়ালে দুর্ভিক্ষের মুখোমুখি হতো একটা সম্পদশালী ধনী দেশ পকেট ভর্তি সোনা থাকার পরেও। যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়া, ইরাক, ইয়েমেনের বেকারত্ব ও নাগরিক চাপ মধ্যপ্রাচ্যের ধনী দেশগুলোর উপর পড়বে যেটা এতদিন ইউরোপ ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো ভোগ করেছে। আবার মধ্যপ্রাচ্যের ধনী দেশগুলো অর্থনৈতিক বিপর্যয়ে পড়লে বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, আফ্রিকা (মহাদেশের)সহ যেসব দেশ তাদের কাছে শ্রম বিক্রি করে এবং যেসব দেশের আয়ের ক্ষেত্রে এই রেমিট্যান্সের কোনো বিকল্প নেই (যেমন-ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ)  তারাও মন্দার মধ্যে পড়বে।

তবে ইরান, উত্তর কোরিয়া, কিউবা, ভেনিজুয়েলাসহ অন্যান্য নিষেধাজ্ঞা জর্জরিত দেশসমূহ বাকি দেশের মত হঠাৎ করে বিপর্যয়ে পড়ার সম্ভাবনা অনেক কম। বরং তাদের ক্ষেত্রে করোনা বিশ্ববাণিজ্য করার একটা সুযোগ হয়েও আসতে পারে। তাদের অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিক্রি করার সুযোগ তৈরি হতে পারে যা এতদিন পারতো না। সেখানে আগে থেকেই কম ক্রয়ক্ষমতায় নাগরিক অভ্যস্ত, অভ্যন্তরীণ সম্পদের উপরেই তারা নির্ভরশীল পরিস্থিতি অনুকূলে না থাকলে তাৎক্ষণিকভাবে মানিয়ে নেয়ার ক্ষমতাও তারা অর্জন করে ফেলেছে। চাহিদাও তুলনামুলক কম। তাদের এই চাপ সহ্য করার ক্ষমতাই তাদের শ্রেষ্ঠত্বের আসনে বসাবে।  

করোনা পরবর্তী বিশ্ব হয়তো আরেকটা মোড় নিতে যাচ্ছে। গত এক শতাব্দী যাবত ইসলামকে শত্রু ট্রিট করে ওয়ার অন টেররের নামে সারা দুনিয়ার মুসলমানদের জীবনকে জাহান্নাম করে দেয়া আমেরিকা হয়তো তার সাম্রাজ্য টিকিয়ে রাখতে ইসলামের জায়গায় চীনকে রিপ্লেসমেন্ট করবে। তারই অংশ হিসেবে ইন্দোপ্যাসিফিক অঞ্চলে নৌ শক্তি বৃদ্ধি করে চলেছে। চীনের মুখোমুখি পূর্ণ শক্তির সামরিক সরঞ্জাম নিয়ে দাড়াচ্ছে। অর্থনৈতিক যুদ্ধকে আমেরিকা হয়তো সামরিকভাবে মোকাবেলার জন্য অন্যান্য অঞ্চলের ঘাঁটি থেকে সামরিক বাহিনীর জনবল ও উপকরণ সরিয়ে এনে চীনের মুখোমুখি দাঁড় করাচ্ছে।

তাই যদি হয় তাহলে মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন মদদে টিকে থাকা শাসক গোষ্ঠী, প্রক্সি মিলিট্যান্ট,  লিবারেল ও এক্সট্রিমিস্ট ইসলাম প্রভাইডার একাডেমি ও একাডেমিক থিংক ট্যাংক যারা পরোক্ষভাবে পশ্চিমের সহযোগী তারা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আগামী বিশ্ব না হবে কলোনি ক্যাপিটালিজমের আর না হবে ইউনিপোলার গ্লোবাল সিস্টেমের। সেটা হতে পারে ছোট ছোট ইউনিয়নের মতো। মত,পথ ও উদ্দেশ্যকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠতে পারে সেই সব ইউনিয়ন। অথবা দুনিয়ার ভেতরে একাধিক দুনিয়া যেখানে একক দেশ বা জোট ক্ষমতা দেখাতে পারবে না।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Articles

Back to top button
Close
%d bloggers like this: